রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৩৭ অপরাহ্ন
এম.কে. রানা ॥ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বরিশাল নগরীতে অটোরিকশা, সিএনজি, বাস ও নৌপরিবহন খাতে ভাড়া নিয়ে চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নির্ধারিত সরকারি ভাড়া তালিকার কার্যকর প্রয়োগ না থাকায় যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ বাড়ছে। ফলে নগরজুড়ে যাত্রী ও পরিবহন চালকদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা প্রায় নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সচেতন নাগরিকদের মতে, ভাড়া নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব থাকায় পরিবহন খাতে অরাজকতা তৈরি হয়েছে। দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, স্বল্প দূরত্বে আগে যাত্রীপ্রতি অটো বা সিএনজি ভাড়া ১০ থেকে ২০ টাকা নেওয়া হলেও গত এক সপ্তাহ ধরে তা বেড়ে ২৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। একইভাবে রিজার্ভ অটো বা সিএনজি ভাড়া আগে যেখানে ১০০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, বর্তমানে সেখানে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, জ্বালানি তেলের সংকট কিংবা মূল্যবৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে চালকরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন। অনেক ক্ষেত্রে দূরত্ব বা নির্ধারিত কোনো হিসাব ছাড়াই পরিস্থিতি বুঝে ভাড়া নির্ধারণ করা হচ্ছে। এতে সাধারণ কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও নিম্ন আয়ের যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।
বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) সূত্র জানায়, প্রায় ৭ থেকে ৮ বছর আগে নগরীতে অটোরিকশা ও সিএনজির ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে কার্যকর কোনো নির্ধারিত ভাড়া তালিকা নেই। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই চালকরা নিজেদের মতো ভাড়া আদায় করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে নগরীতে অবৈধ হলুদ অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যানবাহনের এই অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি ভাড়া নিয়ন্ত্রণকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আনতে ছয় মাস আগে বরিশাল মেট্রোপলিটন ট্রাফিক বিভাগকে লিখিতভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
এ অবস্থায় বিসিসি নতুন উদ্যোগ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী এক সপ্তাহ নগরজুড়ে মাইকিং ও প্রচারণা চালিয়ে অবৈধ যানবাহন অপসারণের নির্দেশনা দেওয়া হবে। এরপর পুলিশের সহযোগিতায় অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ যানবাহন জব্দ করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এ বিষয়ে ট্রাফিক বিভাগের কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে রাজি হননি।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে এবং তার নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে গত ১৮ এপ্রিল সরকার জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য ঘোষণা করে। নতুন মূল্য অনুযায়ী ডিজেল লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা এবং পেট্রোল ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। একই সময়ে দ্বিতীয় দফায় এলপিজির দামও বৃদ্ধি পায়। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণার পরপরই বরিশালে পরিবহন খাতে ভাড়া বাড়ানোর প্রবণতা শুরু হয়।
অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করার আগেই দূরপাল্লার বাস, অভ্যন্তরীণ গণপরিবহন এবং লঞ্চ মালিকরা নিজেদের সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় শুরু করেছেন।
ঢাকা-বরিশাল রুটে চলাচলকারী বাসগুলোতে পূর্বের তুলনায় ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন রুটেও ১০ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।
শনিবার সরেজমিনে বরিশাল নতুল্যাবাদ বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, সায়েদাবাদগামী সাকুরা, হানিফ, লাবিবা, এনা, বিএমএফ ও শ্যামলীসহ অন্তত দশটি পরিবহন ৬০০ টাকা করে ভাড়া নিচ্ছে। অথচ আগে একই রুটে ভাড়া ছিল ৫০০ টাকা।
কিছু পরিবহন কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, তারা আগে ৫৫০ টাকা ভাড়া নিতো এবং এখন মাত্র ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৬০০ টাকা নিয়েছে। তবে অন্যান্য পরিবহন কর্মকর্তারা সরাসরি তেলের দাম বৃদ্ধিকে ভাড়া বাড়ানোর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ঢাকা-বরিশাল রুটে চলাচলকারী সাকুরা পরিবহনের বরিশাল কাউন্টারের ম্যানেজার আনিসুর রহমান আনিস বলেন, তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ৫০ টাকা ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৩০ পয়সা ভাড়া বেড়েছে। ঘোষণার আগেই ভাড়া বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়লে ভাড়া সমন্বয় করতেই হয়।
তবে বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষারত যাত্রীরা এ যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি, ঢাকা-বরিশাল রুটের দূরত্ব প্রায় ১৬৫ কিলোমিটার। ভাড়া ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা হওয়ায় প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৬০ পয়সা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অযৌক্তিক। তারা অভিযোগ করেন, তেলের দাম বাড়লে ভাড়া বাড়ে কিন্তু কমলে আর কমানো হয় না। ফলে মালিক সমিতির স্বেচ্ছাচারিতার শিকার হচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা।
নৌপথেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ঢাকা-বরিশাল নৌরুটে লঞ্চ ভাড়া ১০০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণিতে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধির আগে ডেক ভাড়া ছিল ২০০ টাকা, যা বর্তমানে ৩৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
একইভাবে সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া ১,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ১,২০০ টাকা এবং ডাবল কেবিনের ভাড়া ২,০০০ টাকা থেকে ২,৪০০ টাকা করা হয়েছে। ফ্যামিলি, সেমি-ভিআইপি ও ভিআইপি কেবিনেও ২০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগেই ভাড়া বাড়ানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা। তারা অভিযোগ করেন, পরিবহন মালিকরা নিজেদের সিদ্ধান্তে ভাড়া নির্ধারণ করছেন, যা নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
সুরভী লঞ্চের মালিক এবং কেন্দ্রীয় লঞ্চ মালিক সমিতির নেতা রেজিন উল কবির বলেন, তারা নতুন ভাড়া নির্ধারণ করেননি। পূর্বে যাত্রীদের সুবিধার্থে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম নেওয়া হতো। তেলের দাম বাড়ার পর এখন সরকার নির্ধারিত ভাড়াই কার্যকর করা হয়েছে।
বরিশাল নৌবন্দর কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান জানান, বর্তমানে যে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে তা পূর্বে সরকার নির্ধারণ করেছিল। সরকারি নির্ধারিত ভাড়ার বেশি আদায় করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সচেতন মহলের মতে, ভাড়া নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা এবং দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর মনিটরিং না থাকায় বরিশালে পরিবহন খাতে এক ধরনের অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দ্রুত নতুন ভাড়া তালিকা নির্ধারণ, নিয়মিত তদারকি এবং অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান ছাড়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা কঠিন হবে।
Leave a Reply